সন্তানদের স্বপ্ন ছুঁতে এগিয়ে আসার আহবান।

স্বপ্নের কোনো সীমা নেই: অভিভাবকদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

একটি ছোট্ট শিশু যখন জন্মায়, তখন তার চোখে থাকে অসীম সম্ভাবনা। সে জানে না সে ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, উদ্যোক্তা হবে, নাকি বিশ্বের পরবর্তী বড় কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবনের অংশ হবে। কিন্তু বড় হতে হতে অনেক সময় আমরা, অভিভাবকরা, অজান্তেই তার স্বপ্নের চারপাশে সীমারেখা এঁকে দিই। আমরা বলি, “এটা তোমার দ্বারা হবে না।”আমরা বলি, “এত বড় স্বপ্ন দেখো না।”

আমরা বলি, “নিরাপদ চাকরি পেলেই যথেষ্ট।”

কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে।

বিশ্বের অনেক বড় সফল মানুষের গল্প দেখলে দেখা যায়, তাদের স্বপ্নের সীমা ছিল না। তারা এমন কিছু কল্পনা করেছিলেন, যা তাদের চারপাশের মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি।

বিশ্বের বর্তমান ১নম্বর ধনী উদ্যোক্তা এলন মাস্ক মাত্র ৯ বছর বয়সেই কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করেছিলেন। সেই ছোট্ট ছেলেটিই পরে এমন কোম্পানি গড়েছেন, যা মহাকাশে রকেট পাঠায়, বৈদ্যুতিক গাড়ির ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছে।

আজ বাংলাদেশের অনেক গ্রাম থেকেও নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করছে। যে গ্রামের মানুষ ইন্টারনেট এর ব্যবহার জানতো না, সরকার বিমুখ ছিলো, সেই বনাঞ্চলের গ্রাম ও পাহাড়ের গ্রামগুলোতেও তৈরি হচ্ছে আগামীর প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ গড়ার দক্ষ কারিগর।

নকরেক আইটির সপ্তম শ্রেণিতে পড়া একটি ছেলে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখছে। সে শুধু বইয়ের পড়াশোনা করছে না; সে নিজের হাতে ওয়েবসাইট তৈরি করছে, ডিজিটাল সমস্যা সমাধান করছে, নতুন কিছু সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। মুভি ওয়েবসাইট তৈরি করেছে। বিশ্বকাপ যেখানে ওয়েবসাইটে ৬০০ কোটি মানুষ দেখছে, সেই ওয়েবসাইটও সে তৈরি করতে পারছে।

আজকের পৃথিবীতে একজন কিশোরের হাতে থাকা একটি ল্যাপটপ বা কম্পিউটার অনেক সময় একটি ছোট কারখানার চেয়েও শক্তিশালী সম্পদ হতে পারে।

সুবীর নকরেক একজন তথ্যপ্রযুক্তি উদোক্তা। তিনি সম্প্রতি সারা বাংলাদেশ থেকে টপ টেন ইন্সপায়ারিং হিরো এওয়ার্ড পেয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তির ফ্রিল্যান্সার গড়ার কারিগর হিসেবে। https://inspiring10.com/

কারণ আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে দক্ষতাই সবচেয়ে বড় পুঁজি।

রিচ ড্যাড, পুর ড্যাড আমাদের কী শেখায়?

বিশ্ববিখ্যাত বই “Rich Dad Poor Dad”-এ রবার্ট কিয়োসাকি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলেছেন।

অনেক মানুষ সন্তানকে শেখায়—

“ভালো করে পড়ো, ভালো চাকরি করো।”

কিন্তু আরেক ধরনের শিক্ষা আছে—

“ভালো করে শিখো, সমস্যা সমাধান করো, মূল্য সৃষ্টি করো, উদ্যোক্তা হও।”

প্রথম চিন্তাধারা চাকরির জন্য প্রস্তুত করে।

দ্বিতীয় চিন্তাধারা নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করে।

বর্তমান পৃথিবীতে কেবল চাকরি খোঁজার চেয়ে দক্ষতা অর্জন করে নতুন সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এআই পৃথিবীকে বদলে দিচ্ছে

আজ বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা নতুন নতুন প্রযুক্তি দেখছি।

সুবীর নকরেক
খাগড়াছড়ি রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবানে ডিজিটাল ডিজিটাল স্কিল ট্রেনিং প্রদানের জন্য লং ড্রাইভের একাংশ।

রেফারির সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ, অফসাইড নির্ধারণ, ম্যাচ বিশ্লেষণ, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন—সবখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে।

বাংলাদেশেও প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

ঢাকার অনেক এলাকায় স্মার্ট ক্যামেরা ও ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত হচ্ছে। ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যাংকিং—প্রায় প্রতিটি খাতেই প্রযুক্তি ও এআই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

যে শিশু আজ এআই ব্যবহার করতে শিখছে, সে আগামী দিনের চাকরিপ্রার্থী নয়; বরং সে আগামী দিনের চাকরিদাতা, উদ্ভাবক কিংবা উদ্যোক্তা হতে পারে।

কেন অনেক অভিভাবক এখনো দ্বিধায়?

অনেক অভিভাবক এখনো মনে করেন—

“কম্পিউটার শিখে কী হবে?”

ফ্রিল্যান্সিং কি আসলেই ক্যারিয়ার?

“ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা ডিজিটাল মার্কেটিং কি ভবিষ্যৎ?”

এই প্রশ্নগুলো স্বাভাবিক।

কারণ তারা এমন সময়ে বড় হয়েছেন, যখন প্রযুক্তি এতটা বিস্তৃত ছিল না।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই প্রযুক্তিনির্ভর। বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের আধিপত্য স্পষ্ট। কারণ প্রযুক্তি শুধু একটি পেশা নয়; এটি আজকের অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

গ্রাম থেকে বিশ্বজয়

একসময় বড় কিছু করতে হলে শহরে যেতে হতো।

আজ একটি ইন্টারনেট সংযোগ এবং একটি কম্পিউটার অনেক দূরের পথকে কাছে নিয়ে এসেছে।

আজ একজন শিক্ষার্থী ময়মনসিংহ, গারো পাহাড়, রংপুর, খাগড়াছড়ি, দিনাজপুর, কক্সবাজার, টেকনাফ, তেতুলিয়া, কুড়িগ্রাম বা বান্দরবান থেকে বসেও বিশ্বের জন্য কাজ করতে পারে।

সে ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে।

মোবাইল অ্যাপ বানাতে পারে।

ডিজিটাল মার্কেটিং করতে পারে।

এআই ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করতে পারে।

এই সুযোগ ইতিহাসে আগে কখনো ছিল না।

সন্তানকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুত করুন। একটি পরীক্ষার ফলাফল জীবনের একটি ছোট অংশ।

কিন্তু সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা,

যোগাযোগ দক্ষতা,

প্রযুক্তিগত দক্ষতা,

সৃজনশীলতা,

উদ্যোক্তা মানসিকতা—

এসবই একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে সফল করে।

যদি আপনার সন্তান প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ দেখায়, তাকে থামাবেন না।

যদি সে ওয়েবসাইট বানাতে চায়, উৎসাহ দিন।

যদি সে এআই শিখতে চায়, পাশে দাঁড়ান।

যদি সে নতুন কিছু তৈরি করতে চায়, তাকে সুযোগ দিন।

যদি ডাক্তার হতে চায়, উৎসাহ দিন

ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়? সাহস দিন

পাইলট হতে চায়? পাশে থাকুন

যে খেলোয়ার হতে চায়, সুযোগ দিন।

ভাবুন পুরো বিশ্ব খেলায় আজ মাতোয়ারা। আপনি নিজেও হয়তোবা। মেসি, রোনাল্ডোর মত নিজের সন্তান শীর্ষে যাক তা কি স্বপ্ন দেখা যায়না?

ভবিষ্যতের পৃথিবী শুধু ডিগ্রির মূল্যায়ন করবে না; দক্ষতারও মূল্যায়ন করবে।

তথ্যপ্রযুক্তির আলো জেলেছেন এই তিনজন ব্যক্তি। টিশার্ট পড়াঃ কথা সাহিত্যিক রাহিতুল ইসলাম, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং এআই স্পেশালিস্ট সুবীর নকরেক এবং প্রযুক্তিবিদ ও লেখক আব্দুল্লাহ আল কাফি।

টাঙ্গাইল মধুপুরের একটি গ্রামের গল্প

একটি গ্রাম। সেই গ্রামের একজন বাবা।

তিনি একজন কৃষক।

সারাদিন মাঠে কাজ করেন।

রোদে পোড়েন।

বৃষ্টিতে ভিজেন।

তার একটি ছেলে আছে।

ছেলেটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

বাবা চান ছেলে বড় হয়ে একটি ভালো চাকরি করুক।

এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু একদিন বাবা দেখলেন ছেলেটি বইয়ের পাশাপাশি কম্পিউটারে বসে কিছু করছে।

বাবার প্রথম প্রশ্ন—

“এসব করে কী হবে?”

কারণ বাবা জানেন না।

বাবার দোষও নেই।

যে জগৎ তিনি দেখেননি, সেটি তিনি কীভাবে বুঝবেন?

কিন্তু সেই ছেলেটি ওয়েবসাইট তৈরি শেখা শুরু করেছে।

ধীরে ধীরে HTML, CSS, JavaScript শিখছে।

এআই ব্যবহার করে নতুন নতুন জিনিস তৈরি করছে।

সে শুধু মোবাইলে সময় নষ্ট করছে না।

সে তৈরি করছে।

শিখছে।

চেষ্টা করছে।

ব্যর্থ হচ্ছে।

আবার চেষ্টা করছে।

এভাবেই তো বড় হওয়া শুরু হয়।

অনেক স্বপ্ন অভিভাবকদের ভয়ের কাছে হেরে যায়। যেহেতু অভিভাবকগণ অনেকেই বর্তমান প্রযুক্তি নিয়ে কম রিসার্চ করেন, সেটি সমস্যা না বলে তাদেরও জানাতে হবে।

পৃথিবীর অসংখ্য স্বপ্ন জন্ম নেওয়ার আগেই মারা যায়।

কারণ স্বপ্ন দেখার মানুষটি অযোগ্য নয়।

বরং আশেপাশের মানুষ তাকে বিশ্বাস করেনি।

কত ছেলেমেয়ে আছে যারা ছবি আঁকতে ভালোবাসত।

কতজন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চাইত।

কতজন ব্যবসা শুরু করতে চাইত।

কিন্তু তারা শুনেছে—

“এসব করে লাভ নেই।”

“এসব দিয়ে ভবিষ্যৎ হবে না।”

“চাকরি করলেই নিরাপদ।”

ফলে তারা থেমে গেছে।

তাদের প্রতিভা থেমে গেছে।

তাদের সম্ভাবনা থেমে গেছে।

কিন্তু ইতিহাসে যত বড় পরিবর্তন এসেছে, তার অধিকাংশই এসেছে সেই মানুষদের কাছ থেকে, যাদের স্বপ্নকে একসময় অবাস্তব বলা হয়েছিল।

এলন মাস্ক যখন মাত্র ৯ বছরের

আজ পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত উদ্যোক্তা এলন মাস্ক।

কিন্তু তিনি জন্ম থেকেই ধনী ছিলেন না।

ছোটবেলায় তিনি বই পড়তেন।

প্রযুক্তি নিয়ে খেলতেন।

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখতেন।

মাত্র ৯-১০ বছর বয়সেই তিনি প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করেন।

১২ বছর বয়সে নিজের তৈরি একটি কম্পিউটার গেম বিক্রি করেন।

ভাবুন তো।

সেই সময় অনেক শিশু খেলনা নিয়ে খেলত।

আর একজন শিশু সফটওয়্যার তৈরি করছিল।

আজ সেই মানুষটির প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান মহাকাশে রকেট পাঠায়।

এটাই দক্ষতার শক্তি।

একটি পাখি ডানা মেলে উড়তে শেখার আগে আকাশের সীমা জানে না।

আমাদের সন্তানেরাও ঠিক তেমন।

অনেক সময় তাদের সীমাবদ্ধতা তাদের নিজের নয়; আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা।

তাই আসুন, আমরা সন্তানদের শুধু নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন না দেখিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শেখাই।

কারণ স্বপ্নের কোনো সীমা নেই।

আজকের একটি ছোট্ট দক্ষতা,

আগামী দিনের একটি বড় প্রতিষ্ঠান হতে পারে।

আজকের একটি কৌতূহলী শিশু,

আগামী দিনের একজন প্রযুক্তি নেতা হতে পারে।

আজকের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত,

একটি পরিবারের, একটি গ্রামের, এমনকি একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। যে ভবিষ্যৎ বদলের গল্প তৈরি করছি আমরা।

শেষ কথা: “স্বপ্নকে চাকরির খাঁচায় বন্দি করবেন না”

পাশে থাকুন।

(লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়লে, মতামত কমেন্টে জানান এবং আরো ১০০অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দিন শেয়ার করে)

Subir Nokrek, CEO, Nokrek IT Institute

Google AI Certified Specialist

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *